স্টিভ জবসের বক্তৃতা

দুনিয়া কাঁপানো স্টিভ জবস এর একটি অনন্য বক্তৃতা | আমার শেষ গল্পটি মৃত্যু নিয়ে | পর্ব -৩

যদি প্রশ্ন করা হয়, এই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বপ্নবান মানুষটি কে ? কোনো রকম বির্তক ছাড়াই যে নামটি আসবে তা হলো স্টিভ জবস । একজন প্রকৃত স্বপ্নদ্রষ্টা, সফল উদ্যোক্তা এবং একজন নিষ্ঠাবান মানুষ বলতে আসলে যা বুঝায় স্টিভ জবস আসলে তাই ।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ২০০৫ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন তিনি ।  অসাধারণ কথামালার এবং অনুপ্রেরণা মূলক একটি বক্তৃতা ছিলো এটি । এই কালজয়ী বক্তৃতাটিকে আমরা তিন পর্বে সাজিয়েছি । আজ থাকছে তৃতীয় পর্বটি । পড়ুন এবং শেয়ার করে কাছের মানুষদের পড়তে উৎসাহিত করুন ।

পড়ে আসুনঃ স্টিভ জবস এর একটি অনন্য বক্তৃতা-পর্ব ১ 

 

আমার শেষ গল্পটি মৃত্যু নিয়ে।

আমার বয়স যখন ১৭ ছিলো তখন আমি একটা উদ্ধৃতি পড়েছিলামঃ ”তুমি যদি প্রতিটি দিন এটা ভেবে পার কর যে আজই তোমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে একদিন তুমি সত্যি সঠিক হবে”।

এই লাইনটা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিলো, এবং সেই থেকে গত ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি – ”আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো তাহলে আমি কি যা যা করতে যাচ্ছি আজ তাই করতাম, নাকি অন্য কিছু করতাম?”

 স্টিভ জবসের কালজয়ী বক্তৃতা
স্টিভ জবস

ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো

যখনি এই প্রশ্নের উত্তর ”না” হতো পরপর বেশ কিছু দিন, আমি জানতাম আমার কিছু একটা পরিবর্তন করতে হবে।

”আমি একদিন মরে যাবো” – এই কথাটা মাথায় রাখা আমার জীবনে আমাকে বড় বড় সব সিদ্ধান্ত নিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। কারণ সবকিছু – সকল আশা-প্রত্যাশা, গর্ব, ব্যর্থতার ভয় বা লজ্জা – এইসব কিছু মৃত্যুর মুখে নাই হয়ে যায়, শুধুমাত্র সত্যিকারের গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলোই টিকে থাকে।

মৃত্যু সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় আবিস্কার। এটা জীবনের পরিবর্তনের এজেন্ট।

তোমার কিছু হারানোর আছে এই চিন্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে এটা মনে রাখা যে একদিন তুমি মরে যাবে। তুমি নগ্ন হয়েই আছো। অতএব নিজের মনকে না শোনার কোনো কারণই নাই।

প্রায় এক বছর আগে আমার ক্যান্সার ধরা পড়ে। সকাল ৭:৩০ এ আমার একটা স্ক্যান হয় এবং এতে পরিস্কারভাবে আমার প্যানক্রিয়াসএ একটা টিউমার দেখা যায়। আমি তখনো জানতাম না প্যানক্রিয়াস জিনিসটা কী। আমার ডাক্তাররা বললেন এই ক্যান্সার প্রায় নিশ্চিতভাবে অনারোগ্য, এবং আমার আয়ু আর তিন থেকে ছয় মাস আছে। আমার ডাক্তার আমাকে বাসায় ফিরে যেয়ে সব ঠিকঠাক করতে বললেন। সোজা কথায় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া।

পড়ে আসুনঃ স্টিভ জবস এর একটি অনন্য বক্তৃতা-পর্ব ২  

এরমানে হচ্ছে তুমি তোমার সন্তানদের আগামী দশ বছরে যা বলবে বলে ঠিক করেছো তা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বলতে হবে। এরমানে হচ্ছে সবকিছু গোছগাছ করে রাখা যাতে তোমার পরিবারের সবার জন্য ব্যাপারটি যথাসম্ভব কম বেদনাদায়ক হয়। এরমানে হচ্ছে সবার থেকে বিদায় নিয়ে নেওয়া।

এভাবে সেদিন সারাদিন গেলো। সেদিন সন্ধ্যায় আমার একটা বায়োপসি হলো। তারা আমার গলার ভেতর দিয়ে একটা এন্ডোস্কোপ নামিয়ে দিলো, এরপর আমার পেটের ভেতর দিয়ে যেয়ে আমার ইনটেস্টাইন থেকে সুঁই দিয়ে কিছু কোষ নিয়ে আসলো। আমাকে অজ্ঞান করে রেখেছিলো তাই আমি কিছুই দেখিনি।

যারা বেহেশতে যেতে চায়, তারাও সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরে যেতে চায় না।

কিন্তু আমার স্ত্রী পরে আমাকে বলেছিলো যে আমার ডাক্তাররা যখন এন্ডোস্কোপি থেকে পাওয়া কোষগুলি মাইক্রোস্কোপ এর নিচে রেখে পরীক্ষা করা শুরু করলো তখন তারা প্রায় কাঁদতে শুরু করেছিলো, কারণ আমার যে ধরণের প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়েছিলো সেটার আসলে সার্জারীর মাধ্যমে চিকিৎসা সম্ভব। আমার সেই সার্জারী হয়েছিলো এবং এখন আমি সুস্থ্য।

এটাই আমার মৃত্যুর সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়া, এবং আমি আশা করি আরো কয়েক দশকের জন্যও এটা তাই যেনো হয়। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যাওয়ার এই বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে মৃত্যু সম্পর্কে এখন আমি অনেক বেশি জানি, যেটা আমি জানতাম না যদি না এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না যেতামঃ কেউই মরতে চায় না।

এমনকি যারা বেহেশতে যেতে চায়, তারাও সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরে যেতে চায় না। কিন্তু এরপরও মৃত্যুই আমাদের সবার গন্তব্য। কেউই কখনো এটা থেকে পালাতে পারেনি। এবং সেটাই হওয়া উচিৎ, কারণ মৃত্যু সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় আবিস্কার। এটা জীবনের পরিবর্তনের এজেন্ট।

পড়ে আসুন | শৈশব থেকেই যিনি প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছেন

মৃত্যু পুরনোকে ধুয়ে মুছে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়। এই মুহুর্তে তোমরা হচ্ছো নতুন, কিন্তু খুব বেশিদিন দূরে নয় যেদিন তোমরা পুরনো হয়ে যাবে এবং তোমাদেরও ধুয়ে মুছে ফেলা হবে। নাটকীয়ভাবে বলার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটা খুবই সত্যি।

তোমাদের সময় সীমিত, অতএব, অন্য কারো জীবন যাপন করে সময় নষ্ট করো না। কোনো মতবাদের ফাঁদে পড়ো না, অর্থ্যাৎ অন্য কারো চিন্তা-ভাবনা দিয়ে নিজের জীবন চালিয়ো না। তোমার নিজের ভেতরের কন্ঠকে অন্যদের চিন্তা-ভাবনার কাছে আটকাতে দিও না। আর সবচেয়ে বড় কথাঃ নিজের মন আর ইনটুইশন এর কথা শোনার সাহস রাখবে। ওরা ঠিকই জানে তুমি আসলে কি হতে চাও। বাকী সব কিছু ততোটা গুরুত্মপূর্ণ নয়।

আমি যখন তরুণ ছিলাম তখন একটা পত্রিকা বের হতো যার নাম ছিলো ”The Whole Earth Catalog (সারা পৃথিবীর ক্যাটালগ). এটা ছিলো আমার প্রজন্মের একটা বাইবেল। এটা বের করেছিলেন স্টুয়ার্ড ব্র্যান্ড নামে এক ভদ্রলোক যিনি মেনলো পার্কের কাছেই থাকতেন। তিনি পত্রিকাটিকে কাব্যময়তা দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। এটা ছিলো ষাট এর দশকের শেষ দিককার কথা – কম্পিউটার এবং ডেস্কটপ পাবলিশিং তখনো শুরু হয়নি।

নিজের মন আর ইনটুইশন এর কথা শোনার সাহস রাখবে। ওরা ঠিকই জানে তুমি আসলে কি হতে চাও।

স্টিভ জবসের কালজয়ী বক্তৃতা
স্টিভ জবস

তাই পত্রিকাটি বানানো হতো টাইপরাইটার, কাঁচি, এবং পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে। পত্রিকাটিকে ৩৫ বছর আগের পেপারব্যাক গুগল বলা যায়ঃ অনেক তত্ত্ব-তথ্যে সমৃদ্ধ আর মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত।স্টুয়ার্ট এবং তার টিম পত্রিকাটির অনেকগুলি সংখ্যা বের করেছিলো। পত্রিকাটির জীবন শেষ হয় একটা সমাপ্তি সংখ্যা দিয়ে।

এটা ছিলো সত্তর এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমার বয়স ছিলো তোমাদের বয়সের কাছাকাছি। সমাপ্তি সংখ্যার শেষ পাতায় একটা ভোরের ছবি ছিলো। তার নিচে ছিলো এই কথাগুলিঃ ”ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো”। এটা ছিলো তাদের বিদায় বার্তা। এবং আমি নিজেও সবসময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করে এসেছি।

ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো। সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top